হৃদয় হোসাইন,পাবনা প্রতিবেদক:
পাবনা-১ সংসদীয় আসন (সাঁথিয়া-বেড়া) আংশিক নিয়ে গঠিত। এটি বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর। ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত যারা ৬৮ পাবনা-১ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।তারা মন্ত্রী,প্রতিমন্ত্রী,ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত এ আসনের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় অনেক উত্থান পতনের ইতিহাস।
১৯৭৩ সালে (সীমানা পরিবর্তনের আগে) এই আসনে মুহাম্মদ মনসুর আলী। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। মনসুর আলী সিরাজগঞ্জ জেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। পড়াশোনার জন্য পাবনা আসেন। এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন ৷ ১৯৪৫ সালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম.এ এবং 'ল' পাস করেন৷ ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত পাবনা জেলা মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে পরিচিত হন ৷ কলকাতা থেকে দেশে ফেরার পর পাবনার স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা আমজাদ হোসেন,আব্দুর রব বগা মিঞা, আমিন উদ্দিন অ্যাডভোকেট প্রমুখের সাথে তার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে৷ ১৯৫১ সালে তিনি আওয়ামী-মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং আইন ব্যবসা শুরু করেন পাবনা জেলা আদালতে৷ পাবনা আইনজীবী সমিতির নির্বাচিত সভাপতিও ছিলেন। আওয়ামী মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হন এবং দলের পাবনা জেলা কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন৷ শহরে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে গ্রেফতার হন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন৷ এ আসনের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আব্দুল্লাহ্ আল মাহমুদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন মনসুর আলী। আব্দুল্লাহ্ আল মাহমুদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়৷ ১৯৫৬ সালে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে বিভিন্ন সময় পূর্ববঙ্গ কোয়ালিশন সরকারের আইন ও সংসদ বিষয়ক,খাদ্য ও কৃষি এবং শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন ৷ স্বাধীনতা পরবর্তীতে,১৯৭২-এর জানুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তানি কারাগার থেকে দেশে ফিরে মন্ত্রী পরিষদ পুনর্গঠন করেন৷ এবার মনসুর আলী দায়িত্ব নেন প্রথমে যোগাযোগ ও পরে স্বরাষ্ট্র এবং যোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে৷ হার্ডিঞ্জ ব্রিজ মেরামতে রাখেন ভূমিকা৷ (সীমানা পরিবর্তনের আগে) ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চের নির্বাচনে মনসুর আলী পুনরায় পাবনা-১ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন৷ শেখ মুজিবুর রহমান সকল দলকে একত্রিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি চালু করেন৷ এ সময় ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মনসুর আলী বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভার প্রধান মন্ত্রীর দায়িত্ব নেন৷ ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক গঠিত বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের (বাকশাল) সাধারণ সম্পাদক হন তিনি।
১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে নির্বাচন করে জহুরুল ইসলাম তালুকদার দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচিত হন।
সীমানা পরিবর্তনের পর,১৯৮৬ জাতীয় পার্টি ও ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর মনজুর কাদের মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। এবং ৩ মার্চ ১৯৮৮ সাল থেকে ৪ ডিসেম্বর ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পানি উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আবার ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মনোনয়নে সিরাজগঞ্জ-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-৫ আসন থেকে অংশ নিয়ে তিনি মাত্র ১২৬ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন। ১৯৭৬ সনের ১৮ মার্চে সেনাবাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনে এ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।
মতিউর রহমান নিজামী ১৯৯১ সালে জামায়াতে ইসলামীর হয়ে সংসদীয় পাবনা-১ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৯৪ পর্যন্ত সংসদে জামায়াতের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ (বর্তমান ইসলামী ছাত্র শিবির) সাথে যুক্ত হন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ পযন্ত দুইবার তিনি পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল,সেক্রেটারী জেনারেল এবং ২০০০ সালে আমীরের দায়িত্ব পালন করেন।১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি তার প্রার্থীতা হারান এবং আওয়ামী লীগ হয়ে অধ্যাপক আবু সাইয়িদ এ আসন থেকে নির্বাচিত হন। তিনি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে সংসদ সংসদ নির্বাচিত হন এবং কৃষি ও শিল্প মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩/২০১৪ সংস্করণের তালিকায় দ্যা রয়েল ইসলামিক ষ্ট্র্যাটেজিক ষ্টাডিজ সেন্টার নামক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ৫০০ জন মুসলমান রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে তিনি স্থান লাভ করেন। পরের ইতিহাস সবারই জানা।
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। আবু সাইয়িদ একজন বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ,লেখক ও গবেষক,মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক,সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক পাবনা জেলা গভর্নর ছিলেন। তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তৎকালীন মন্ত্রী পরিষদে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পাবনা ৮ ও ১ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাকশালের প্রার্থী হিসেবে। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে। এবং ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে।২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণফোরাম হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে পরাজিত হন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে পরাজিত হন।গণফোরাম এর নির্বাহী সভাপতি,অধ্যাপক ড.আবু সাইয়িদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাকসু ভিপি ছিলেন।১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে তিনি এম.এন.এ নির্বাচিত হন । ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সাত নম্বর সেক্টরে উপদেষ্টা ও ক্যাম্প ইনচার্জ ছিলেন। ১৯৭২ সালে গঠিত ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন পাবনা-৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ছিলেন।
২০০৮ থেকে ২০২৪ পযন্ত এ আসন থেকে শামসুল হক টুকু আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কায় মনোনয়ন পেয়ে টানা ৪ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। দুইবারের ডেপুটি স্পিকার এ্যাড.শামসুল হক টুকু। বিদ্যুৎ জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২২ সালের ২৮ আগষ্ট তিনি ১১ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত আশ্রয় নেন। পরদিন ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙ্গে দিলে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারিয়ে কারাগারে আছেন। দিনে দিনে এ সকল সংসদ সদস্যরা তাদের রাজনৈতিক প্রতীভা,মেধা,শ্রম ব্যায় করে পাবনা-১ সংসদীয় আসনটিকে গুরুত্বপূর্ণ আসনে পরিণত করে।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : সোনারগাঁও শপিং কমপ্লেক্স ৪র্থ তলা, মোগরাপাড়া চৌরাস্তা, সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জ।
প্রকাশক
ও সম্পাদক: মোঃ ইমরান হোসেন
মোবাইল
: 01822219555
মেইল
: emranhossain9555gmail.com
বার্তা
সম্পাদক : মোঃ পারভেজ হোসেন
মোবাইল
: 01826178999
মেইল : parvezoks@gmail.com
Copyright © 2026 দেশ প্রকাশ. All rights reserved.